" সংস্কৃত কি ও কেন পড়বেন?"
অনেকের একটা ভ্রান্ত ধারণা আছে—সংস্কৃত একটা ভাষা। কিন্তু না সংস্কৃত শুধুই একটা ভাষা না এটা ভারতীয় জাতিসত্তার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। এর রস একটু পান করে দেখুন আনন্দে বুঁদ হয়ে যাবেন। আমাদের প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশ যেমন বলেছিলেন—
"বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি পৃথিবীর মুখ খুঁজিতে চাই না আর"
তেমনি আপনিও বলবেন—
"সংস্কৃতের রস আমি পান করিয়াছি , অন্য রস খুঁজিতে চাই না আর।"
অন্য সকল জাতির পূর্বপুরুষেরা যখন বনে-বাদাড়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াতেন, তখন আমাদের পূর্বপুরুষেরা পৃথিবীর সর্বপ্রথম সাহিত্য ও দর্শনের উন্নত গ্রন্থ বেদ লিখে ফেলেছেন। গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যোতিষশাস্ত্র, চিকিৎসাশাস্ত্র প্রভৃতির অনেক উন্নত চর্চা আমাদের মুনিঋষিরা করে গেছেন। পৃথিবীর সর্বপ্রথম ভাষাতত্ত্বের ও ব্যাকরণের গ্রন্থ আমাদের মনীষীদেরই রচনা। আচার্য পাণিনির ব্যাকরণ কতটা scientific এবং গুরুত্বপূর্ণ তা নিচের মতামতগুলো পড়লেই বুঝতে পারবেন---
‘---the grammar of Panini—is one of the greatest monuments of human intelligence.’’ (Leonard Bloomfield)
—the earliest scientific work in any language any Indo-European language.’’
(Prof. R.H. Robins)
‘‘What is more, it seems that even Panini’s grammar can be interpreted as a fragment of such a ‘generative grammar’ in essentially the contemporary sense of this term.’’ (Noam Chomsky)
আপনি কি নাস্তিক? তাহলে বেদ-উপনিষদগুলি একবার পড়ে দেখুন তো? না না, আপনার ভয় নেই, আপনি নাস্তিকই থাকবেন, কিন্তু আপনার দৃষ্টিভঙ্গী আরো স্বচ্ছ হবে।
আপনি যদি আস্তিক হন, তাহলে বেদ-উপনিষদ-গীতা, রামায়ণ, মহাভারত পড়া ছাড়া আপনার অন্য কোন বিকল্প নেই।
আপনি কি ডাক্তারি পড়েন বা করেন বা মেডিকেল সায়েন্স নিয়ে গবেষণা করেন বা কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়েন বা গবেষণা করেন?
তাহলে কষ্ট করে একবার চরকসংহিতা, সুশ্রুতসংহিতা এবং আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের অন্যান্য গ্রন্থগুলি একবার পড়ে দেখুন।
অঙ্ক নিয়ে যাদের কারবার তাঁরা ব্রহ্মগুপ্ত, ভাস্করাচার্য, শ্রীধরাচার্য প্রমুখের গ্রন্থ পড়ে দেখুন। আর যদি আর্কিটেক্চার নিয়ে কাজকর্ম করেন তাহলে আমদের প্রাচীন বাস্তুশাস্ত্রের বইগুলি পড়ে দেখুন। আশা করি আপনারা নিরাশ হবেন না। এই প্রসঙ্গে আপনাদের একটা তথ্য দিচ্ছি--
আপনারা নিশ্চয়ই বিখ্যাত বাঙ্গালী বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের নাম জানেন, যাঁর অনেক বিখ্যাত গবেষণা এবং উদ্যোগ বাংলার অনেক উন্নতি সাধন করেছিল সেই প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। তিনি টানা ১৫ বছর নিবিষ্টচিত্তে সংস্কৃত পড়েছেন এবং প্রাচীন রসায়ন শাস্ত্রের অনেক গ্রন্থের রহস্য উদ্ঘাটন করেছেন। তিনি ২০০-এর বেশী রসায়ন শাস্ত্রের গ্রন্থের কথা বলেছেন।
যারা ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব নিয়ে পড়ছেন বা পড়াচ্ছেন বা গবেষণা করছেন তাঁরা মহাভারত, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, কামন্দকীয় নীতিসার, নীতিবাক্যামৃত, শুক্রনীতিসার, মনুসংহিতা, যাজ্ঞবল্ক্য সংহিতা, পরাশর সংহিতা, বৃহস্পতি সংহিতা, বিদূরনীতি ইত্যাদি গ্রন্থ থেকে অনেক তথ্য পেতে পারেন।
যারা রাজনীতি করেন, নেতা-মন্ত্রী হন, দেশ চালান—আপনারা উক্ত বইগুলি পড়ে দেখুন,আপনারা যে পদ্গুলিতে আসীন আছেন সেই পদের গুরুত্ব, সেই পদলাভের যোগ্যতা, কাজের ধরণ, কি কি Moral code of conduct মেনে চলতে হয়, তা যদি আপনারা অনুসরণ করেন, তাহলে সাধারণ পাবলিক আপনাদের salute জানাবে।
যারা কাব্যতত্ত্ব ও নাট্যতত্ত্ব চর্চা করেন, তাদের তো সংস্কৃত কাব্যতত্ত্ব ও নাট্যতত্ত্ব আরো ভাল করে পড়তে হবে। দীর্ঘ প্রায় ২০০০ বছর ধরে সংস্কৃতে এর আলোচনা হয়েছে। কয়েকটি গ্রন্থের নাম উল্লেখ করছি—
ভরতের নাট্যশাস্ত্র, ধনঞ্জয়ের দশরূপক, সাগরনন্দীর নাটকলক্ষণরত্নকোষ,আনন্দবর্ধনের ধ্বন্যালোক, দন্ডীর কাব্যাদর্শ, মম্মটের কাব্যপ্রকাশ, বিশ্বনাথের সাহিত্যদর্পণ, রাজশেখরের কাব্যমীমাংসা, কুন্তকের বক্রোক্তিজীবিত, জগন্নাথের রসগঙ্গাধর ইত্যাদি।
যারা দর্শন নিয়ে পড়াশুনা, গবেষণা বা শিক্ষকতা করেন, তাদের তো original সংস্কৃতে লেখা বই পড়তে হয়। যেমন—তর্কসংগ্রহ, ভাষাপরিচ্ছেদ, সাংখ্যতত্ত্ব কৌমুদী, সাংখ্যপ্রবচনভাষ্য, যোগসূত্র, বেদান্তসার, ব্রহ্মসূত্র-শাঙ্করভাষ্য প্রভৃতি। তাঁদের অনেকেরই কেবলমাত্র বাংলা বা ইংরেজি অনুবাদের উপর নির্ভর করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। ফলে মূলের রস তারা পান না।
আপনারা কি জানেন—যাকে এতদিন আমরা শুধুই ধর্মগ্রন্থরূপে মেনে এসেছি, সেই ‘গীতা’ নিয়ে এখন নতুন করে চিন্তা-ভাবনা চলছে—কীভাবে আধুনিক ম্যানেজমেন্টে গীতার উপদেশ কাজে লাগানো যায় তা নিয়ে?
যে কোন আকর গ্রন্থের বৈশিষ্টই তাই। যুগে যুগে মানুষের প্রয়োজনে তার নতুন করে মূল্যায়ন হয়, মানুষ তা থেকে বাঁচার রসদ খুঁজে পায়। সেইজন্য ক্লাসিক গ্রন্থ এবং প্রাচীন সংস্কৃতির নিত্য নতুন আলোচনা ও গবেষণার প্রয়োজন।
সংস্কৃত আমাদের জীবনে যে কতটা প্রয়োজনীয় সেই সম্বন্ধে আপনাদের কিছু তথ্য দিচ্ছি—
আপনি হয়তো কোন প্রিয়জনের শোকে মুহ্যমান, একটু থিতু হয়ে গীতার সাংখ্যযোগ, জ্ঞানযোগ অধ্যায় দুটি একটু মনোযোগ দিয়ে পাঠ করুন, দেখবেন আপনার এক অনির্বচনীয় অনুভূতি হবে। আপনি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে গেছেন। শুধু তাই নয়, আপনার ভিতরেও অনেক পরিবর্তন আসবে যেটা সারা জীবন আপনাকে হিতাকাঙ্ক্ষী অভিভাবকের মতো গাইড করবে।
মনে যে কোন ধরণের অশান্তি এলে গীতা-উপ নিষদ একাগ্রচিত্তে পাঠ করলে মন শান্ত হয়। এটা শুধু আমার একার কথা নয়, এটা অনেক মনীষীর উপলব্ধি।
জ্ঞানের কোন জাত নেই, ধর্ম বা সম্প্রদায়ও নেই। জ্ঞানে সকলের সমান অধিকার। তাই যে কোন লোক এই বইগুলি পড়তে পারে। পড়ে দেখুন উপকার ছাড়া অপকার হবে না। original সংস্কৃতে এবং যথাযথ উচ্চারণ করে পাঠ করলে দেখবেন মনে কি নিবিড় প্রশান্তি!
আপনি হয়তো ঝিমিয়ে পড়েছেন, কাজে উৎসাহ পাচ্ছেন না, এনার্জি লস, আপনি শ্রী শ্রী চন্ডী পড়ুন, বা ঋগ্বেদের বাক্ সূক্তের মন্ত্রগুলি জোরে জোরে পাঠ করুন, দেখবেন আপনার সমস্ত জড়তা কেটে গেছে।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে Music therapy, Counselling এর কার্যকারিতা এখন স্বীকার করা হয়। আমাদের বেদ, উপনিষদ, গীতা এবং অন্যান্য অনেক গ্রন্থে যে সমস্ত মন্ত্র এবং শ্লোক আছে সেগুলির ছন্দ এবং ধ্বনিমাধুর্য অপূর্ব। এগুলির যথাযথ আবৃত্তির মাধ্যমে সেই therapy-র কাজ করা যেতে পারে।
শব্দের যে অপরিমেয় শক্তি আছে তা আমাদের প্রত্যক্ষ-লব্ধ জ্ঞান। আপনি যদি সুন্দর করে কথা বলেন, প্রিয় কথা বলেন, দেখবেন আপনি নিজেও অন্য সকলের প্রিয় হয়ে গেছেন।
এই শব্দশক্তির বা বাক্ শক্তির গূঢ় রহস্যের কথা আমাদের দার্শনিক এবং বৈয়াকরণরা সবিস্তারে বলে গেছেন। আমি কয়েকটি লাইন আপনাদের বলছি—
‘’ইদমন্ধংতমঃ কৃৎস্নং জায়েত ভুবনত্রয়ম্।
যদি শব্দাহ্বয়ং জ্যোতিরাসংসারং ন দীপ্যতে।।
(কাব্যাদর্শ/১ম পরিচ্ছেদ)
(এই ত্রিভুবন ঘন অন্ধকারে আচ্ছন্ন থাকত, যদি শব্দরূপ জ্যোতি সমগ্র সংসারকে আলোকিত না করত।)
গৌর্গৌঃ কামদুঘা সম্যক্ প্রযুক্তা স্মর্যতে বুধৈঃ।
দুষ্প্রযুক্তা পুনর্গোত্বং প্রযোক্তুঃ সৈব শংসতি।।
(কাব্যাদর্শ/১ম পরিচ্ছেদ)
(বুধগণ বা পন্ডিতগণ সম্যক্ভাবে প্রযুক্ত শব্দ বা বাক্ -কে কামধেনুর মত মনে করেন। অর্থাৎ শব্দ ঠিক ঠিক ভাবে প্রয়োগ করলে তা থেকে অভীপ্সিত অর্থ লাভ করা যায়। আবার, এই শব্দই যদি ঠিকভাবে প্রয়োগ করা না হয়, তাহলে বক্তার মূর্খতাই প্রতিপাদন করবে। )
আচার্য ভর্তৃহরি শব্দ নিয়ে অনেক গভীর দার্শনিক আলোচনা করেছেন। তাঁর বাক্যপদীয় গ্রন্থটি অনেক দার্শনিক, বৈয়াকরণ ও ভাষাতত্ত্ববিদের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু। এখনও এই বই নিয়ে গবেষণা চলছে।
কেউ বলেন—সংস্কৃত dead language, কেউ বলেন— living language। প্রকৃতপক্ষে সংস্কৃত ভারতবর্ষের আত্মা (Soul), সংস্কৃত সমগ্র ভারতের চেতনা (conciousness)। সংস্কৃত ছাড়া ভারতবর্ষ অস্তিত্বহীন। আপনারা অনেকেই জানেন ভারতবর্ষকে ভালবেসে কত বিদেশী মনীষী সারাটা জীবন উৎসর্গ করেছেন। কিসের জন্য? ভারতবর্ষে কী ছিল যার জন্য তাঁদের এই আত্মত্যাগ? তাঁদের জীবনব্যাপী নিরলস সাধনা? কীসের জন্য? তা হল—ভারতবর্ষের সংস্কৃতি যা সংস্কৃতে বিধৃত।
ভারতবর্ষের প্রাচীন মুনি-ঋষিরা সুদীর্ঘকাল যাবৎ কঠোর তপস্যায় জগৎ ও জীবনের যে সুগভীর সত্য উপলব্ধি করেছিলেন, তাই সংস্কৃত ভাষায় লিপিবদ্ধ করেছেন। যুগে যুগে সেই জীবন সত্যের সন্ধান পেতে বিদেশী পর্যটকরা এসেছেন। নিজেদের দেশে নিয়ে গেছেন আমাদের পূর্বপুরুষদের সত্যসন্ধানী আলো। এর দ্বারা তাঁরা জীবন-পথের দিশা খুঁজে পেয়েছেন।
বিশ্বমানবতাবাদ- প্রতিষ্ঠা, মানুষে মানুষে মৈত্রীস্থাপন, সমগ্র জীবজগৎ ও জড়জগৎ-এর সঙ্গে আত্মিক সম্পর্কস্থাপন, এককথায় সমস্ত বিশ্ববাসীর কল্যাণসাধন ভারতবর্ষের চিরন্তন সাধনা। আমাদের উপনিষদে বার বার এই কথাই ধ্বনিত হয়েছে। আমরা আমাদের গৌরবময় অতীতকে ভুলেছি বলেই আজ আমাদের এই দুর্দশা। আমাদের নীতি-নৈতিকতা আজ তলানিতে ঠেকেছে। আমাদের সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। আমরা মানবিক গুণগুলি হারিয়ে ফেলছি। সমাজের creamy layer বলে যারা সম্মানিত তাঁরাও আজ অবক্ষয়ের শিকার। এই চোরাবালিতে পড়ে আমরা যেন অসহায়ভাবে নিজেদের ধ্বংস নিজেরাই দেখতে পাচ্ছি।
একটি সুন্দর শ্লোক দিয়ে শেষ করছি-
‘’সমানী ব আকূতিঃ সমানা হৃদয়ানি বঃ।
সমানমস্তু বো মনো যথা বঃ সুসহাসতি।।
(ঋগবেদ—সংজ্ঞানসূক্ত)
(তোমাদের অভিপ্রায় এক হোক, অন্তঃকরণ এক হোক, মন এক হোক, তোমরা যেন সর্বাংশে সম্পূর্ণরূপে একমত হও।
তথ্যসূত্র - ইন্টারনেট ও বিভিন্ন পেইজ।
👫 শেয়ার করে সবাইকে জানার সুযোগ করে দিন।
আপনার মূল্যবান মতামতের অপেক্ষায়।
নিজে জানুন অন্যকে জানান।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন