"সন্ধি" - পর্ব ১

পর্ব ১

বিভিন্নভাবে সন্ধিকে সংজ্ঞায়িত করা যায়। যেমন: সন্ধি অর্থ মিলন অর্থাৎ পাশাপাশি দুই বর্ণের মিলনকে সন্ধি বলে। অথবা বর্ণকে আশ্রয় করে অর্থপূর্ণ দুটি শব্দকে যে সূত্রে একশব্দ করা হয় তাকে সন্ধি বলে। অথবা প্রথম শব্দের শেষবর্ণ এবং দ্বিতীয় শব্দের প্রথমবর্ণ মিলে নতুন শব্দ তৈরির প্রক্রিয়াকে সন্ধি বলে। অথবা উচ্চারণের সময় কাছাকাছি দুবর্ণের মিলনকে সন্ধি বলে। অথবা বর্ণ সংযোগে বা লোপে নতুন অর্থবোধক গঠিত শব্দকে সন্ধি বলে। অথবা বর্ণকে আশ্রয় করে অর্থসংগতিপূর্ণ দুটি শব্দকে একশব্দে পরিণত করার প্রক্রিয়াকে সন্ধি বলে।



সন্ধি মিলন, বিকৃত ও লোপেও হয়ে থাকে। যেমন :

#মিলন (প্রথম শব্দে শেষ বর্ণ এবং দ্বিতীয় শব্দের প্রথম বর্ণ): বিদ্যা +আলয়=বিদ্যালয়।

#বিকৃতি (পূর্ব বর্ণের বা পরের বর্ণের বিকৃতি): উৎ+চারণ=উচ্চারণ, যাচ +না =যাচঞা।

#লোপ (পূর্ব বর্ণের বা পরের বর্ণের বিকৃতি): অতঃ+এব=অতএব, উৎ+স্থান =উত্থান /ইতি+আদি =ইত্যাদি,        ইতি+মধ্যে =ইতোমধ্যে।

ব্যাকরণবিদগণ বিভিন্নভাবে সন্ধির সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। যেমন :

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ : বর্ণদ্বয়ের মিলনকে সন্ধি বলে।
ড. সুকুমার সেন : পরস্পর অত্যন্ত সন্নিহিত দুই বর্ণের মিলনকে সন্ধি বলে।
ড. মুহম্মদ এনামুল হক : একাধিক ধ্বনির মিলন, লোপ বা পরিবর্তনের নাম সন্ধি।
অশোক মুখোপাধ্যায় : একান্ত সন্নিহিত বা অব্যবহিত দুটি ধ্বনির মিলনের নাম সন্ধি।
জ্যোতিভূষণ চাকী : দ্রুত উচ্চারণের ফলে পরস্পর সন্নিহিত ধ্বনির পরিবর্তন হয়।এতে দুটি ধ্বনির মিলন, পরিবর্তন কিংবা লোপ হতে পারে। এরূপ মিলন বা লোপ বা পরিবর্তনকে সন্ধি বলে।

সন্ধির উপাদান:

সন্ধি নিয়মের কয়েকটি উপাদান রয়েছে। যেমন : ধ্বনি ও বর্ণ, পূর্বপদ,পরপদ।

সন্ধির কাজ বা সন্ধির প্রয়োজনীয়তা:

সন্ধির কাজ হলো উচ্চারণ ঠিক রাখার নতুন শব্দ গঠন করা। ভাষার জন্য সন্ধির ব্যবহার খুব প্রয়োজন। যেমন: সন্ধি ভাষাকে শ্রুতিমধুর, প্রাঞ্জল ও সংক্ষিপ্ত করে, উচ্চারণ ও বানান শুদ্ধ ও সঠিক করে, দুটি বর্ণে মিলন, বিকৃত ও লোপ ঘটিয়ে একটি বর্ণের মাধ্যমে নতুন শব্দ গঠন করে এবং শব্দের অর্থের পরিবর্তন ও বিস্তার ঘটায়।
শব্দ উচ্চারণের সুবিধার্থে এবং ভাষার সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য সন্ধির উদ্ভব হয়েছে। সন্ধির জন্যই দুটি শব্দ একসঙ্গে উচ্চারণ করা যায়। সাধারণত দুটি বর্ণের মিলনে সন্ধি হয় তবে বিকৃতি বা লোপেও সন্ধি হয়। আবার সকল ক্ষেত্রে সন্ধি হয় না। যেমন: অর্থ+ অভাব= অর্থাভাব, দুর+অবস্থা=দুরাবস্থা, মান+অভিমান =মানাভিমান ইত্যাদি।
নামের ক্ষেত্রেও সন্ধির সুবিধা নেয়া হয়। যেমন শরৎ+চন্দ্র=শরৎচন্দ্র /শরচ্চন্দ্র, রবি+ইন্দ্র =রবীন্দ্র। তবে সন্ধিজাত বা সমাসজাত নামবাচক শব্দ একশব্দ হয় তা আগের লেখকগণ করতেন না তবে বর্তমানে করা হয়। যেমন: রামমোহন, বঙ্কিমচন্দ্র, পরমেশ প্রসন্ন, বসন্ত কুমার।

সন্ধির প্রকার:

বিভিন্নভাবে সন্ধির প্রকরণ দেখানো যায়। যেমন:

ক) উৎপত্তিগত:

১. সংস্কৃত সন্ধি
সংস্কৃত শব্দ+সংস্কৃত শব্দ
২. দেশি সন্ধি
দেশি শব্দ + দেশি শব্দ
(সংস্কৃত ও দেশি শব্দের
মিলনে সন্ধি হয় না)

ক) গঠনগতঃ

১. স্বরসন্ধি
২. ব্যঞ্জনসন্ধি
৩. বিসর্গসন্ধি

গ) অনিয়মগত:

১. নিপাতনে সন্ধি:
কিছু সন্ধিজাত শব্দ সন্ধির প্রকৃত নিয়ম না মেনে তৈরি হয় বলে তাদের নিপাতনে সন্ধি বলে। যেমন:

1.স্বরনিপাতনে সন্ধি
            গো+অক্ষ = গবাক্ষ
2. ব্যঞ্জননিপাতনে সন্ধি
            পর+পর = পরস্পর

বিভিন্ন প্রকার সন্ধির সংজ্ঞা ও উদাহরণ:

১. স্বরসন্ধি: স্বরবর্ণ ও স্বরবর্ণের মিলনে যে সন্ধি হয় তাকে স্বরসন্ধি বলে। যেমন: নর+অধম= নরাধম।

২. ব্যঞ্জনসন্ধি : স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ অথবা ব্যঞ্জনবর্ণ ও স্বরবর্ণ অথবা ব্যঞ্জনবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণের মিলনে যে সন্ধি হয় তাকে ব্যঞ্জনসন্ধি বলে। যেমন: পরি+ছদ=পরিচ্ছদ, দিক+অন্ত=দিগন্ত, উৎ+ লাস =উল্লাস।

৩. বিসর্গসন্ধি (ঃ উঠে যায়): বিসর্গবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণের মিলনে যে সন্ধি হয় তাকে বিসর্গসন্ধি বলে। সাধারণত ‘র’ ও ‘স’-এর সংক্ষিপ্ত রূপকে বিসর্গ সন্ধি বলে। যেমন: ততঃ+অধিক=ততোধিক, মনঃ+ রম=মনোরম, অন্তঃ>অন্ত, নমঃ>নমস।

৪. নিপাতনে সন্ধি : নিয়মহীনভাবে যে সন্ধি হয় তাকে নিপাতনে সন্ধি বলে। যেমন: গো+অক্ষ=গোঅক্ষ বা গোবক্ষ বা গোবাক্ষ না হয়ে হবে গবাক্ষ, এখানে ‘ব’ না থাকা শর্তেও ‘ব’ এসেছে। অন্য+অন্য= অন্যান্য, পর+পর= পরস্পর, তৎ+কর=তস্কর।

বি.দ্র. পরবর্তী পর্বে সংস্কৃত সন্ধি সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।



👫 শেয়ার করে সবাইকে জানার সুযোগ করে দিন।
আপনার মূল্যবান মতামতের অপেক্ষায়।
নিজে জানুন অন্যকে জানান।
পরিশেষে সবাইকে ধন্যবাদ।🙏

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

"সংস্কৃত ভাষা শেখার জন্য সহায়ক কয়েকটি বই"

"সংস্কৃতে কথা বলার হাতে-খড়ি" পর্ব-১

”যে বইটি দিয়ে সংস্কৃত শেখা শুরু করবেন (pdf সহ)“