"দুর্গা পূজা ও কুমারী পূজা"
দুর্গা পূজা ও কুমারী পূজা:
চণ্ডীর বর্ণনা অনুযায়ী, দুর্গম নামক অসুরকে বধ করায় দেবী মায়ের নাম হয়েছে দুর্গা। দুর্গম অসুরের কাজ ছিল জীবকে দুর্গতিতে ফেলা। দুর্গমকে বধ করে যিনি স্বর্গ বিতাড়িত দেবগণকে হৃতরাজ্যে ফিরিয়ে দেন এবং জীবজগতকে দুর্গতির হাত থেকে জীবন রক্ষা করেন তিনিই মা দুর্গা।
"যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেন সংস্থিতা।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।"
"যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেন সংস্থিতা
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ।"
সনাতন ধর্মশাস্ত্রে দুর্গা নামটির ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে ‘দ’ অক্ষর দৈত্যনাশক, উ-কার বিঘ্ননাশক, রেফ রোগনাশক, গ অক্ষর পাপনাশক ও অকার ভয় শত্রুনাশক। তার মানেই দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও ভয়-শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন, তিনিই শ্রী দুর্গা।
শ্রী শ্রী চণ্ডী অনুসারে এই দেবীই ‘নিঃশেষদেবগণশক্তিসমূহমূর্ত্যা’ বা সকল দেবতার সম্মিলিত শক্তির প্রতিমূর্তি। তিনি আমাদের দুর্গতি থেকে ত্রাণ করেন বলেই দেবীর নাম হয়েছে দুর্গা।
এ পূজার মূর্তি কল্পনায় ফুটে উঠেছে শৌর্যবীর্য (কার্তিক), জ্ঞানভক্তি (সরস্বতী), সিদ্ধি (গণেশ), সম্পদ (লক্ষী) এবং মানবজীবনের ইহকালের বস্তুলাভ এবং অন্তিমকালে মাতৃক্রোড়ে চির আশ্রয়। আর মায়ের পদতলে মহিষাসুর অশুভ এবং অহংকারের প্রতীক, যা জগতের অমঙ্গলের হেতু। তাকে আবার শাসন করছেন স্বয়ং দেবী, যিনি কল্যাণময়ী বরাভয়দায়িনী হিসেবে জগতের কল্যাণ করে আসছেন। দশভুজা মায়ের দশটি হাত দশ দিকের প্রতীক। অর্থাৎ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্রই ঈশ্বর বিরাজমান। মা দাঁড়িয়ে আছেন ত্রিভঙ্গ ভঙ্গীমায়। তা হলো সৃজনী, পালনীত ও সংহারী শক্তির প্রতীক- অর্থাৎ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রতীক তাহলে দেখা যাচ্ছে যে যিনি ব্রহ্মারূপে সৃষ্টি করেন, বিষ্ণুরূপে পালন করেন শিবরূপে তিনিই বিশ্ব প্রসারিণী, মাতৃরূপিনী শ্রী শ্রী দুর্গা।
পরাশক্তির অধিকারী অসুরকে বধ করার জন্য মা দুর্গা দশ হাতে দশ অস্ত্রে সুসজ্জিত তার দশ হাত দশ দিকরক্ষার প্রতীক। তার পায়ের নিচে আছে উদ্ধত সিংহ আর উদ্ধত অসুর। সিংহ রাজসিক ও অসুর তামসিক শক্তির প্রতীক।
পূজার ষষ্ঠীতে দেবীর ষষ্ঠাদিকল্প অর্থাৎ আবাহন, বোধন, আমন্ত্রণ, অধিবাস প্রভৃতি অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। এই ষষ্ঠীতে সন্ধ্যাকালে দেবীর বোধন হয়। পুরাণ শাস্ত্র মতে, দেবীর বোধন হয় বিল্ববৃক্ষে বা বিল্বশাখায়।
অন্যদিকে সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত প্রতিমায় দেবীর অর্চনা করা হয়ে থাকে সপ্তমীতে অন্যতম অনুষ্ঠান নবপত্রিকা প্রবেশ কদলীবৃক্ষসহ আটটি উদ্ভিদ এবং জোড়াবেল একসঙ্গে বেঁধে শাড়ি পরিয়ে বধূর আকৃতির মতো তৈরি করে দেবীর পাশে স্থাপন করা হয়, প্রচলিত ভাষায় একে কলাবউ বলে।
পূজার অষ্টমীতে বিশেষ অনুষ্ঠান অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিতে দেবীর বিশেষ পূজা ‘সন্ধিপূজা’। অষ্টমী তিথিতে কোনো কুমারী বালিকাকে পূজা করা হয়।
নবমীকে হোমযজ্ঞের দ্বারা পূজার পূর্ণহুতি দেয়ার রীতি।
দুর্গাপূজায় দশমী তিথিতে হয় দেবীর বিসর্জন। পূজায় দশমী তিথি বিজয়া দশমী নামে খ্যাত। হিন্দুদের প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে এই দিনে শ্রীরামচন্দ্র কর্তৃক রাবণ নিহত হয়েছিলেন। একই কারণে স্বর্গ-মর্ত্যওে দুর্দিনে দুর্গতিনাশিনী দুর্গার আবির্ভাবও হয়েছিল। সকল দেবতার সম্মিলিত তেজ সৃষ্টি করেছিল মহামায়াকে। আবার সেই শক্তি বলীয়ান হয়েই দেবী চণ্ডী অশুভকে বিনাশ করে স্বর্গ-মর্ত্যরে মতো আর শান্তি প্রতিষ্ঠা করে ধর্মের অন্তর্নিহিত অর্থকেই আবার ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছিল।
মা দেবী দুর্গার আশীর্বাদে শ্রীরামচন্দ্র রাক্ষসরাজ রাবণকে পরাজিত করার পর সীতাকে উদ্ধার করলেন সেই থেকে শরতকালে হয়ে আসছে দুর্গাপূজা।
কুমারী পূজা:
কুমারী পূজা মাতৃভাবে ঈশ্বরেরই আরাধনা। কুমারী কন্যাকে জীবন্ত প্রতিমা করে তাতে জগজ্জননীর উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। দুর্গাপূজার অষ্টমী বা নবমীতে সাধারণত ৫ থেকে ৭ বছরের একটি কুমারীকে প্রতিমার পাশে বসিয়ে দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়। দুর্গাজ্ঞানে পূজা করে সকলের মধ্যে মাতৃভাবেরই সঞ্চার করা হয়। প্রায় সর্বজাতীয়া কন্যাকেই কুমারীরূপে পূজা করা যেতে পারে। তবে স্বত্বগুণ সম্পন্না-শান্ত, পবিত্র, সত্যশীলা এসব দৈবী সম্পদের অধিকারিণী কুমারীই জগজ্জননীর প্রতিমারূপে গ্রহণের বিধি আছে।
উপনিষদের ভাষায় কবি বলেছেন-
‘পুতুল পূজা করে না হিন্দু কাঠ মাটি দিয়ে গড়া
মৃন্ময়ীর মাঝে চিন্ময়ী হেরী হয়ে যায় আত্মহারা।’
অর্থাৎ কাঠ, মাটি দিয়ে গড়া পুতুল শুধু মৃন্ময়ী রূপ নয়, তা মায়ের চিন্ময়ী জীবন্ত রূপ। তাই তাঁকে শ্রদ্ধা বা পূজা করা।
শ্রীরামকৃষ্ণদেব সেই তত্ত্বকেই বলছেন প্রতীমা মাটি কেন গো? ও তো চিন্ময়ী জীবন্ত রূপ।
সেই প্রতীক রূপেরই জীবন্ত রূপ কুমারী, যা বিশ্বমাতৃত্বের প্রতীক। জগন্মাতাকে শ্রীরামকৃষ্ণদেব মা বলে সম্বোধন করছেন। এই মাতৃশক্তিকে উপাসনা করা হয় দুর্গাপূজায় কুমারী পূজার মাধ্যমে। মাতৃভাবে ঈশ্বরের আরাধনা তাঁর বৈচিত্র্যময়ী আরাধনার একটি রূপ। প্রত্যেক নারীকে মাতৃভাবে ভাবনা মহামায়ার শ্রেষ্ঠ উপাসনা এবং নারী মর্যাদার সর্বোচ্চ বিধি। নারী শুধু ভোগ্যপণ্য নয়, যথার্থ মূল্যায়নে সমাজে তাকে উচ্চাসনে সমাসীন করা। পাখি যেমন একটি ডানায় উড়তে পারে না, সমাজও তেমনি পুরুষ শক্তি দ্বারা চলতে পারে না। কুমারী পূজা নারীকে মূল্যায়নের একটি সর্বোচ্চ শাস্ত্রীয় বিধি। সমগ্র বিশ্বে এই নারীমূর্তি মহামায়া রূপে প্রকাশিতা এবং এরই মাতৃকাশক্তি কুমারী রূপে ঈশ্বরেরই আরাধনা। শ্রীরামকৃষ্ণ এই শক্তিকে মা বলতেন আর অন্য সকলে এই শক্তিকে ঈশ্বর, আল্লাহ বা গড বলে থাকেন। নিরাকার জল যেমন ঠাণ্ডায় বরফ আকার ধারণ করে। নিরাকার ঈশ্বরও তেমনি ভক্তের কাছে ভক্তিতে স্বগুণ সাকার রূপ ধারণ করে। কুমারী পূজা এই উপাসনাই বটে। শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলেছেন, কুমারী পূজা করে কেন? সব স্ত্রীলোকই ভগবতীর এক একটি রূপ। শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর বেশি প্রকাশ। তাই দুর্গাপূজায় এই কুমারী পূজার বিধান। তাঁর শক্তি সর্বভূতে ক্রিয়াশীল। এই শক্তি মাতৃরূপে আবির্ভূতা। তাই তিনি বলেছেন ‘মাতৃভাব সাধনার শেষ কথা’। শক্তিপূজা কেবলমাত্র মাতৃমূর্তিতেই হয়। যেমন : দুর্গা, অন্নপূর্ণা, কালী, জগদ্বাত্রী ইত্যাদি। তাই প্রাচীনকাল থেকে শক্তি পূজার অঙ্গ হিসেবে নারীমূর্তিতে কুমারী পূজা প্রবর্তিত হয়েছে। বর্তমানকালে সমাজ ব্যবস্থায় বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও অনুন্নয়নশীল বিশ্বে সমাজ ব্যবস্থায় নারী নির্যাতিতা। তাই নারীদেহে ভগবানের পূজা সমাজে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক। শ্রীরামকৃষ্ণদেব নিজ স্ত্রীকে ষোড়শীজ্ঞানে পূজা করে মাতৃসম্মানের এক অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
শরতের স্বর্ণিল আবহে স্বর্গের দেবী দুর্গা মর্ত্যবাসীতে নেমে এসে আমাদের যাবতীয় দুঃখ-দুর্দশা ও অশান্তি দূর করে এ পৃথিবীকে শান্তির আলো হিসেবে গড়ে তোলেন। দীর্ঘ একটি বছর পর দুর্গা দেবীর পদতলে পুষ্পাঞ্জল প্রদানের মাধ্যমে সমস্ত বিশ্বের শান্তি ও চিরমঙ্গল কামনা করতে আমরা মিলিত হই এই দিনগুলোতে। সংঘাতময় এই বিশ্বে দেবী দুর্গার আগমন হয়ে উঠুক শান্তি, কল্যাণ ও সুখ-সমৃদ্ধিময়।
সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা।।
তথ্য সূত্র:-দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকা (১৯ অক্টোবর, ২০১৫)।।
👫 শেয়ার করে সবাইকে জানার সুযোগ করে দিন।
আপনার মূল্যবান মতামতের অপেক্ষায়।
নিজে জানুন অন্যকে জানান।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন